পুলিশ ভাই স্যালুট নিও

0
152

দেশপ্রেম, কর্তব্যনিষ্ঠা আর দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য। মানবিকতাবোধ আর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি পুলিশ সদস্যের প্রধান ব্রত। জিটিভি’র স্টাফ রিপোর্টার কাজী জামশেদ নাজিম তার মায়ের অসুস্থতার সময় কীভাবে পুলিশ সদস্যদের দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন শুনুন সে গল্প।

অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকদের দিনের অধিকাংশ সময় পার হয় পুলিশের সঙ্গে। যান্ত্রিক নগরীর ঢাকার অলিতে-গলিতে হাজারও পুলিশ। তাকিয়ে থাকি। চোখ সেই পুলিশদের খোঁজে। যদি একটু চিনতে পারে। কিংবা সেই পুলিশের কেউ যদি আমাকে চিনতে পারে। বছরের পর বছর যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পাচ্ছি না। যদি একবার দেখা পেতাম। অন্তত একবেলা আদরের সাথে ভাত খাওয়াতাম। ভাতের সঙ্গে থাকা মাছ-মাংস আমার মা নিজ হাতে রান্না করতেন। বছর সাতেক আগের কথা। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সূর্য পশ্চিমের আকাশে অস্ত গেছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। মাথা কাজ করছে না। রক্ত প্রয়োজন। ৮ ব্যাগ রক্ত! রক্ত ছাড়া মায়ের অপারেশন হবে না। রক্ত কোথায় পাব?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) মা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কিডনির পিত্তথলিতে পাথর জমেছে। চিকিৎসকরা বলেছেন-এক সময় তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। সে জন্য শরীরে পাথর জমেছে। পাথর না বের করলে মা সুস্থ হবেন না। জন্মের পর থেকে মাকে বড় বড় হাঁড়ি-পাতিলে রান্না করতে দেখেছি প্রতিদিন অর্ধশত ব্যক্তির রান্না হতো আমাদের বাড়িতে। ক্ষেত-খামারের শ্রমিক, দাদার ৯ ছেলে ও তাদের স্ত্রী-সন্তানের খাবার প্রস্তুতের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন মা ও দাদী। আস্তীয়স্বজনরা বেড়াতেন দিনের পর দিন। দুই ফুফু ও তাদের সন্তানরা মায়ের রান্না ছাড়া কিছু খান না।

আজ মা অসুস্থ। সবার সংসার আলাদা। কেউ আর কারও খবর রাখেন না। মা তিন মাস ধরে অসুস্থ। গোপালগঞ্জ সদর, বরিশাল ও ফরিদপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন। সুস্থ হননি। ঢাকায় আনার সাহস পাচ্ছিলাম না। সঞ্চিত মাত্র ৭ হাজার টাকা আছে হাতে। ঢাকায় থাকার স্থান নেই। হাসপাতালে মাকে দেখভাল করারও কেউ নেই। বিধাতার ওপর আস্থা রেখে মাকে ঢাকায় আনলাম। সঙ্গে ছোট্র বোন ময়না। মায়ের জন্য সব সময় তার চোখে অশ্রু ঝরে। মা হয়তো আর আমাদের মাঝে থাকবেন না! এমন ভাবনায় মুখটা ওর সারাক্ষণ কালোই থাকে। মায়ের মুখেও হাসি নেই। এতবড় হাসপাতাল, বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি হয়তো ভাবেন চিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আসবে! আমি সবেমাত্র পেটে-ভাতে সাংবাদিকতা শুরু করেছি। অপারেশন করা জরুরি হলেও চিকিৎসকরা মাকে অজ্ঞান করতে সাহস পাচ্ছেন না। মায়ের হার্টবিট কম। তাদের ধারণা, অজ্ঞান করা হলে আর ফিরে আসবে না।

অবশেষে এক চিকিৎসক কৌশলে মায়ের হার্টবিট পরীক্ষা করলেন। চিকিৎসক এসে মাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি মারা গেলে আপনার সন্তানদের কি হবে? মা মুচকি হেসে জানালেন, হায়াতের মালিক আল্লাহ। আমার হায়াৎ না থাকলে আপনারা আমাকে জীবিত রাখতে পারবেন না। মায়ের অঙ্গভঙ্গি ও কথা শুনে ডা. শ্যামল ব্যানার্জি জানালেন, রবিবার অপারেশন করা হবে। তবে রক্ত ৮ ব্যাগ! ৮ ব্যাগ রক্ত কোথায় পাব? শাহবাগ মোড়ে হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা। কোটি মানুষের নগরী ঢাকা। কেউ কি রক্ত দেবে আমার মাকে! কার কাছে রক্ত পাব। অগোছালো নানান প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিচিত তেমন কেউ নেই। দু-একটি ব্লাড ব্যাংকে ফোন কওে মোবাইল ব্যালেন্স শেষ। রক্তের সন্ধান পাওয়া গেল না। হাসপাতালের মালি হাফিজ পরামর্শ দিলেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে রক্ত পাওয়া যেতে পারে। টিএসসির দিকে গন্তব্য। জাতীয় জাদুঘরের পাশ ধরে হাটছি। হঠাৎ মোবাইলে একটি ম্যাসেজ। আগামীকাল ডিএমপি কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করবেন। ম্যাসেজটি পাঠিয়েছেন সহকারী পুলিশ কমিশনার শ্যামল কুমার মূখার্জি (বর্তমানে এসপি নাটোর)। ১০ টাকা মোবাইলে রিচার্জ করেই শ্যামল দা কে ফোন দিলাম।

ঘটনা শুনে দাদা বললেন, দেখছি। মাত্র ১০ মিনিট পরেই মোবাইলে ম্যাসেজ এলো ‘ক্রাইম রিপোর্টার নাজিমের মা অসুস্থ। তার রক্তের প্রয়োজন। রক্তের গ্রুপ ও পজেটিভ।’ দাদার পাঠানো ম্যাসেজের নিচে আমার মোবাইল নম্বর। তার মেসেজটি সকল ক্রাইম রিপোর্টার পেয়েছেন। একের পর এক সাংবাদিক ফোন করছেন। অন্তত বিশজন সাংবাদিক ফোন করেছেন। কিন্তু রক্তের সন্ধান হলো না। তাদের সবার কোনো না সমস্যা রয়েছে। রক্তের সন্ধান হলো না। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে মায়ের সামনে হাজির। মা ও বোন একসঙ্গে বলে উঠল-রক্তের সন্ধান পেয়েছি কিনা। আমার মুখে কোন ভাষা নেই। কিছু বলছি না। আমার নিরবতা মা ও বোনের ওপর ভর করেছে। বেশি সময় বসে থাকতে পারলাম না। বারডেম হাসপাতালের উল্টো পাশে দাড়িয়ে আছি। কি করব আমি! মা ও বোনের মুখ দেখে মনে রাজপথের প্রতিটি মানুষকে দাড় করিয়ে এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে রক্ত সংগ্রহ করি। আবার কখনও ইচ্ছে হচ্ছিল-চিৎকার করে বলি-‘মায়ের জন্য রক্ত প্রয়োজন। আমাকে একটু রক্ত দিন।’ রাতের সকল চেষ্টা ব্যর্থ।

সকাল সাড়ে ১১টায় শ্যামল দা ফোন করলেন। জানতে চাইলেন রক্ত পেয়েছি কিনা। জানালাম হয়নি। না শব্দ শুনে দাদাও হতাশ। আমি দেখছি-বলে মোবাইল সংযোগ বিছিন্ন করলেন। হাসপাতালের দেয়ালে হেলান দিয়ে মায়ের মুখে তাকিয়ে আছি। মা শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। দম বন্ধ। হলে কি এভাবেই পড়ে থাকবে মায়ের নিথর দেহ। সারাদিনের সকল চেষ্টা ব্যর্থ। রক্তের ব্যবস্থা হলো না। পরদিন সকালে অপারেশন, তখনও অনিশ্চয়তা। শাহবাগ থেকে রাজপথে হাঁটছি। গন্তব্য মিন্টু রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টার। শ্যামল দাদা বসে আছেন। মুখটা কালো। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। অশ্রুভেজা কন্ঠে বললাম-দাদা আমার মা! নিরব দাদা। কিছু সময় পর (সম্ভবত) তৎকালীন ডিসি (ডিবি) মনিরুল ইসলাম ও ডিসি (সদর) হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কিছু কথা বললেন। কি বলেছিলেন আজও জানি না। দাদা সান্তনা দিয়ে আমাকে হাসপাতালে যেতে বললেন। আমি আসার কিছু সময় পরই হাসপাতালে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হাজির। আমার মাকে রক্ত দিলেন। সকালে অপারেশন হলো। মা আমার আবারও সুস্থ হলেন। সেই যাত্রায় বেঁচে গেলেন। আজ তিনি ছেলের ঘরের নাতিদের নিয়ে খেলাধুলা করছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের এখন ব্ল্যাড ব্যাংক হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here